স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স এর রহস্যময়তার মায়ায়- মুশফিকা রাহমান- Book Review
বই: স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স
মূল লেখক: উকতেসু
অনুবাদক: আহনাম তাহমিদ
মূল ভাষা: জাপানি
ধরন: সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
প্রচ্ছদ: আদনান আহমেদ রিজন
প্রকাশনায়: গ্রন্থরাজ্য
প্রকাশক: রাজীব দত্ত
মুদ্রণ : একাত্তর প্রেস
প্রথম প্রকাশ: জুন ২০২৫
ISBN : 978-984-3937-08-7
মূল্য: ৩৩০.০০ টাকা
আমি সাধারণত থ্রিলার খুব একটা পড়ি না। কেন জানি, ভালো লাগে না। তবে কিছু কিছু থ্রিলারের নাম এত অদ্ভুত বা আকর্ষণীয় হয় যে কৌতূহলবশত পড়েই ফেলি। “স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স” নামটার মধ্যেও ছিল এক ধরনের রহস্যময়তা। খুব ভাবাচ্ছিল যে, কী এমন ছবি থাকতে পারে, যার জন্য বইয়ের নামটাই এমন রাখা হয়েছে?
বইটি পড়ে বুঝলাম—ছবিগুলো সত্যিই বেশ অদ্ভুত, বেশ গোলকধাঁধাময়। ছবিগুলো একই সুতোয় গাঁথা হলেও, একেক এঙ্গেল থেকে একেক সময় ভিন্ন ভিন্ন গল্প বলছে। মনে হচ্ছিল, ছবিগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়, রহস্য আর মনের অন্ধকার কোণ। অবশ্য মনে হচ্ছিলোই বা কী—সত্যিই তেমনি ছিল বটে। কোনো ছবি যে এতটা গভীর, এতটা গূঢ় অর্থ বহন করতে পারে—এই বই না পড়লে তা হয়তো আমি কখনও জানতামই না।
বাপরে বাপ, বইটা যে লিখেছে, তার মাথায় প্যাঁচ আছে বলতে গেলে—নাহলে এমন বই লেখা সম্ভব নয়।
লেখকের চিন্তাধারা এতটাই ঘুরপ্যাঁচে ভরা, মনে হয়, তার মাথার ভেতরেই এক রহস্যের গোলকধাঁধা।
কাহিনির কিছুটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিই:
কাহিনির মূল হচ্ছে, এক গর্ভবতী নারীর আঁকা কিছু নির্দোষ ছবিকে ঘিরে। প্রথমে সেগুলো সাধারণ আঁকিবুকি মনে হলেও, ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে এক নির্মম ও ভয়ানক কাহিনি।
কাহিনিটা বাস্তব হতে পারে, আবার হতে পারে নিছক কল্পনা—তবে যেটাই হোক, শেষটা এমন মোড় নিয়েছে, যা পাঠকের মাথা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। আমার নিজেরও মাথা ঘুরে গেছে।
যাবেই তো।একটি বাচ্চা ছেলের আঁকা ঘরের ছবির মধ্যেও লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর বার্তা। যখন সেটা জানতে পারলাম, সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।
এক খুনের ভিকটিম মৃত্যুর আগে এঁকে যাওয়া একটি স্কেচ, যা অপেশাদার একজন অনুসন্ধানীকে ভাবিয়ে তোলে। সেই স্কেচের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হয় ভয়াবহ এক সত্য।
নয়টি ছবি—প্রতিটিই প্রথমে নির্দোষ মনে হলেও, প্রত্যেকটিতে লুকিয়ে রয়েছে রহস্যময় ইঙ্গিত। পাঠক হিসেবে আমার মতো আপনিও একেকটি সূত্র ধরে এগোতে থাকবেন, আর হারিয়ে যাবেন এক হিমশীতল, শিউরে ওঠা জগতে।
গল্পের শেষদিকে, যখন সব সূত্র একে একে মেলতে শুরু করবে, তখন আপনি নিজেও এক ধরনের দমবন্ধতা অনুভব করবেন।
জাপানিজ এই হরর-মিস্ট্রির রাজ্যে শুরুতে এসে আমি পরিচিত হই সাসাকি ও কুরিহারা নামের দুই তরুণ চরিত্রের সঙ্গে। তারা একে অপরের সহপাঠী না হলেও, তাদের মধ্যে একটা ভালো বন্ধুত্ব আছে। একদিন দুপুরবেলায় ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছিল তারা। তখন কুরিহারা সাসাকিকে একটা ব্লগের সন্ধান দেয়।
তারপর আমি সেই ব্লগ পড়েই আবার পরিচিত হই সদ্য বিবাহিত এক মিষ্টি যুগলের সঙ্গে।
ব্লগের মাধ্যমেই তাদের সম্পর্কে বেশ কাছ থেকে জানতে পারি। খুব ভালো লেগেছিল তাদের এরকম গভীর প্রেম, ভালোবাসা, যত্নময় নিত্যদিনের কাহিনি শুনে। কিন্তু হঠাতই নেমে এলো তাদের সুখী জীবনে এক বিপত্তি। যেটা দেখে একজন পাঠক হিসেবে খুব খারাপ লেগেছিল।
একটা মিষ্টি যুগলের এমন এক অপ্রত্যাশিত বিপত্তির কথা পড়ে মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। অজান্তে তাদের গল্প এতটাই আপন হয়ে ওঠেছিল যে, হঠাৎ ঘটে যাওয়া সেই ঘটনায় যেন আমিও ভেতর থেকে নাড়া খেয়ে উঠলাম। আবার অদ্ভুত এক রকম উত্তেজনাও জেগে উঠল—তারপর কীভাবে কী হলো?
কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, ব্লগে আর কিছুই লেখা ছিল না। কোথাও কোনো ইঙ্গিতও নেই যে এরপর কী ঘটেছিল। এই অসমাপ্ততা যেন কৌতূহলের আগুনে ঘি ঢেলে দিল।
আর তখনই আরেক নতুন উত্তেজনা ঘিরে ধরল—কেন লেখা নেই? কী এমন ঘটেছিল যে লেখক আর লিখলেন না?
এই সব প্রশ্নের উত্তর জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তখন মনের ভিতর তুফান তুলে দিয়েছিল।
মূলত উত্তেজনা প্রবলভাবে শুরু হয় এখান থেকেই।
যদিও থ্রিলার হিসেবে ক্লাইম্যাক্স শুরুতে রহস্যময় ছিল, কিন্তু তারপর একটু শ্লথ হয়ে গেছে।
কিন্তু সেই শ্লথ ভাব থেকেই তা আবার ধীরে ধীরে চুলে ঝটপাকাবার মতো হয়ে ওঠেছে—
মাঝে এসে এমন ঝট লেগেছে যে, রাস্তায় আমরা উন্মাদের মাথায় যেমন ঝট দেখি, ঠিক তেমনই আমার মাথায়ও অদৃশ্য ঝট লেগেছিল।
আমি কোনোভাবে হিসেবই মিলাতে পারছিলাম না। এদিক দিয়ে রাতও বেড়েছে বেশ, কিন্তু এটা শেষ না করে ঘুমানোও যাবে না।
কী এক মহা বিপদ! শেষে একপ্রকার বাধ্য হয়েই খাবারের টেবিলে বসে বাকি পৃষ্ঠাগুলো একটানা পড়ে ফেলেছি।
ক্লাইম্যাক্সটা অসাধারণ ছিল—যা একদমই আশা করিনি।
সবকিছু যেন মাথার উপর দিয়ে গেল।
কি ভেবেছিলাম আর কী হলো—শুই হয়ে শুরু হয়ে যেন ফাল হয়ে শেষ হলো !
একেবারে অপ্রত্যাশিত, আমার চিন্তা-ভাবনার বাহিরে!

অনুবাদের মান:
অনুবাদটি এত সহজ ও প্রাণবন্ত ছিল যে পড়তে বেশ দারুণ লেগেছে।
অনুবাদকের শব্দচয়ন এত সহজ, এত রসাত্মক ও এত নমনীয় ছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল অনুবাদক নিজেই যেন আমার পাশে বসে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প বলছেন, আর আমি বিমুগ্ধ হয়ে সেসব শুনছি।
এই দিক দিয়ে অনুবাদকের প্রশংসা করতেই হচ্ছে।
অনুবাদের মান নিয়ে যদি কিছু বলি, তাহলে নিঃসন্দেহে বলবো—১০০ তে ১০০।
পড়ার সময় চোখ ও মনে বেশ শান্তি অনুভব করেছি।
তাঁর শব্দ নির্বাচনে প্রতিটি চরিত্র ও দৃশ্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এখন এই বইয়ে আমার বিশেষ ভালো লাগা কিছু শেয়ার করছি:
এই বইয়ে এসে অনেক চরিত্রের সাথেই পরিচিত হয়েছি। সবাইকেই প্রায় বেশ ভালোই লেগেছে আমার।
তবে সবচেয়ে বেশি যাকে ভালো লেগেছে—মানে, বইটা যার জন্য বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়েছে—সে হচ্ছে নাউমি কোন্নো নামের এক নীরিহ মিষ্টি বাচ্চা মেয়ে। যার একটা চিপি নামের খুব মিষ্টি ফিঞ্চ পাখি ছিল—গোলগাল দেহ, চোখা চঞ্চু।
সেই বাচ্চা মেয়েটা সারাদিন ঘরদোর পরিষ্কার করা, জামাকাপড় ধোয়া, টুকটাক রান্না করা—এরকম আরও অনেক ঝক্কি সামলানোর পরেও সে পাখির যত্ন নিতে একটুও ত্রুটি রাখেনি।
নিজের মধ্যে স্নেহ-মমতার ঘাটতি থাকলেও,চিপিকে প্রতিদিন মায়ের মতো করে খুব আদরস্নেহে খাবার খাওয়ানো, সাবধানে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া এবং তার সামনে বসে আপন মনে কতশত কথা যে বলে যেত মেয়েটা! এমনভাবে বলত, যেন তখন তার মধ্যে পৃথিবীর সব চমৎকার অনুভূতিগুলো এসে ভির করত।
এই মিষ্টি মেয়েটার মধ্যে অপরিমেয় মাতৃসুলভ ভালোবাসা আছে। যে ভালোবাসা দিয়ে সে শুধু চিপিকেই নয়, দুর্বল সৃষ্টি সবাইকে রক্ষা করতে পারে; রক্ষার্থের প্রয়োজনে সে নির্মমও হতে পারে।
এমন একটা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়ে এত ভালো লেগেছিল আমার। এই কাহিনিটা মূলত এই মেয়েটার জন্যই প্রাণবন্ত মনে হয়েছে।
আর অপরদিকে, এই বইয়ের কাহিনিকে সবথেকে নির্মম মনে হয়েছে এক সাইকো কিলারের জন্য —যে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ঠান্ডা মাথায় একাধিক খুন করতে পারে।
তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, এই কাহিনির সবচেয়ে নীরিহ চরিত্রের সঙ্গে সবচেয়ে নির্মম চরিত্রের একটা সংযোগ আছে—যেটা জানতে হলে পুরো বইটা আপনাকে পড়তেই হবে।
বিশেষ দিক:
এই বইটা পড়ে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পারেছি, যেটায় আমার অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের ভান্ডারে কিছু যুক্ত হয়েছে। বেশ ভালোই হয়েছে এক ডালে দুই পাখি মারার মতো। থ্রিলারের থ্রিলার হলো, আবার এদিক দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দিকেও বেশ কিছু জানা হলো।
রেটিং দিতে হলে, ১০০-এর মধ্যে আমি বইটিকে ৯৮ দেব। কারণ ১০০ তে ১০০ দেওয়া কখনো ঠিক বলে মনে করি না— হোক যতই ভালো।
আমার পরামর্শ:
যারা একটু ভিন্নধর্মী ‘রহস্য’ ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যই উপযোগী।
এমন এক গূঢ় রহস্য যখন আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে, তখন তা কেবল আমাদের কৌতূহলই মেটাবে না, বরং আমাদের চিন্তাজগতকে আরও বিস্তৃত করবে। এই নতুন অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন রোমাঞ্চে ভরপুর, অন্যদিকে তেমনি আমাদের জীবনকে করবে আরও সহজ ।
আরও পড়ুন- পাঠে হাওয়াই মিঠাইয়ের স্বাদ

