প্রচ্ছদসাক্ষাৎকার

মুশফিকা রাহমানের সাথে কথোপকথন

চাঁদপুর জেলার সবুজে ঘেরা শান্তশীতল হলদিয়া গ্রামে ২৬শে ফাল্গুন, ১৪০৫ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেন কবি ও গল্পকার মুশফিকা রাহমান। শৈশব কেটেছে মাটি-ঘ্রাণ, নদীর কলতান আর প্রকৃতির রঙে রঙিন হয়ে। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান এবং সাভার সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি সাভার, ঢাকায় বসবাস করছেন।

লেখালেখির সঙ্গে তাঁর পরিচয় শৈশবেই। প্রথম লেখা স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যা হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনযাত্রার প্রথম ধাপ। গল্প, কবিতা কিংবা প্রবন্ধে তিনি তুলে ধরেন জীবনের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও মানবিকতার নানা রূপ। তাঁর লেখায় মাটি, মানুষ ও মমতার চিরন্তন বন্ধন প্রতিফলিত হয়।

ভবিষ্যতে তিনি সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তুলতে চান এবং শব্দ দিয়ে অনুভূতির জগতকে আরও বিস্তৃত করতে প্রত্যাশী। 

কবি মুশফিকা রাহমান তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবনযাপন নিয়ে কথা বলেছেন পরমপাঠ এর সাথে। নিচে তা তুলে ধরা হলো- 

 

কেমন আছেন?

জি, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

 

আলোচনার শুরুতেই আপনার লেখালেখির জগতে পদার্পণ সম্পর্কে জানতে চাই।

দীর্ঘদিন ধরেই লেখালেখি করছি। লেখার প্রতি আমার এক বিশেষ টান আছে। কেউ যখন আমার লেখা পড়ে তাদের অনুভূতি জানায়, তখন ভীষণ ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা থেকেই ধীরে ধীরে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেছি।

 

 আপনার প্রথম লেখা প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

আমার প্রথম প্রকাশিত বইটি হাতে নেওয়ার মুহূর্তে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল, যা হয়তো কখনোই ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারব না।

 

 আপনার প্রকাশিত লেখা ও বইগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

আমার একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া কিছু যৌথ সংকলন, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও জার্নালে গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও মাঝেমধ্যে লিখি।

 

লেখালেখির শুরুতে আপনার লক্ষ্য কী ছিল? সময়ের সাথে কি তা বদলেছে নাকি একই আছে?

শুরুর দিকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যখন খুব ভালো লাগত বা খুব খারাপ লাগত, তখন লিখতাম। লেখালেখির সাথে আমার আত্মিক সম্পর্ক আছে। পরে হঠাৎ একদিন বই প্রকাশের সুযোগ এল, আর সেই সুযোগেই প্রথমবার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ পেয়ে থাকি। সেটি ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

 

আপনার লেখালেখির বিভাগ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলুন।

মূলত কবিতা ও ছোটগল্প লিখি। মানবিকতা, প্রকৃতি, আধ্যাত্মচেতনা, মূল্যবোধ এবং সামাজিক অসঙ্গতি—এসবই আমার লেখার উপজীব্য।

 

আপনার লেখালেখিতে কোন বিষয় বা থিম কি বারবার ফিরে আসে? কেন এগুলো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

আমার লেখায় ভালোবাসা, চেতনা এবং প্রকৃতি বারবার ফিরে আসে, কারণ এগুলোই মানুষের জীবনের মূল চালিকা শক্তি।

 

আপনার লেখায় কি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়, নাকি সম্পূর্ণ কল্পনা থেকে আসে?

দুটোই মিশে থাকে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লেখাকে প্রাণ দেয়, আর কল্পনা সেটিকে বিস্তৃত করে।

 

আপনার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন দিকগুলো প্রভাব ফেলে?

সামাজিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমার লেখায় প্রভাব ফেলে। তবে রাজনীতি বিষয়ে আমার তেমন ধারণা নেই।

 

আপনি কেন লেখেন? আপনার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য কী?

আমার কাছে লেখা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম এবং একধরনের আনন্দের উৎস।

 

আপনি কি মনে করেন লেখকের কোনো সামাজিক বা নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে? থাকলে কীভাবে তা পালন করেন?

হ্যাঁ, লেখকের উচিত সত্য ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। আমার লেখায় সেই বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করি।

 

আপনার লেখার রুটিন কেমন?

যখন ইচ্ছে হয় তখনই লিখি। প্রতিদিন কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা করি, বিশেষত সন্ধ্যা ও রাতে। তখন লেখায় নিমগ্ন হতে পারি।

 

লেখার সময় কি কখনো ‘রাইটার্স ব্লক’-এর মুখোমুখি হন? হলে কীভাবে কাটিয়ে ওঠেন?

জি, প্রায় সময়ই হয়। তখন বই পড়তেও ভালো লাগে না। এসময় লেখালেখি থেকে বিরতি নিই, বাইরে কোথাও ঘুরে আসি, মানুষের সাথে কথা বলি বা একা সময় কাটাই—এতে নতুন ভাবনা আসে।

 

আপনার লেখার সময় কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশ বা সরঞ্জাম পছন্দ করেন?

নিরিবিলি ঘর, জানালার বাইরের দৃশ্য এবং গান—এসবই আমার লেখার সঙ্গী।

 

কবি মুশফিকা রাহমান

 

লেখা শেষ করার পর কীভাবে সম্পাদনা করেন?

প্রথম খসড়া শেষ করার পর অন্তত এক-দুবার পড়ে সম্পাদনা করি। তবে অতিরিক্ত সম্পাদনা করলে লেখার স্বকীয়তা অনেক সময় হারিয়ে যায়।

 

আপনার প্রথম দিকের লেখালেখির সাথে এখনকার লেখালেখির মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?

এখন লেখায় পরিণত ভাব এসেছে। শব্দচয়ন ও গঠন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতনভাবে করি।

 

আপনার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা কী?

সাফল্য মানে পাঠকের মনে জায়গা করে নেওয়া। স্বীকৃতি ভালো, তবে পাঠকের ভালোবাসাই আসল প্রাপ্তি।

 

বাংলাদেশে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা কি সম্ভব?

কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বহুমুখী কাজের সাথে লেখালেখি করলে সম্ভব।

 

ভবিষ্যতে কী ধরনের লেখা নিয়ে কাজ করতে চান?

ঐতিহাসিক উপন্যাস, কবিতা এবং শিশুতোষ সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে খুব।

 

পাঠকদের সাথে আপনার যোগাযোগ কতটা হয়? তাদের প্রতিক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাঠকদের সাথে যোগাযোগ হয়। তাদের প্রতিক্রিয়া আমার জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

 

সমালোচনা বা নিন্দার মুখোমুখি হলে কীভাবে গ্রহণ করেন?

গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করি, তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনায় নিরুৎসাহিত হওয়ার চেষ্টা করি না।

 

আপনার লেখা কি নির্দিষ্ট কোনো পাঠকগোষ্ঠীর জন্য, নাকি সবার জন্য?

আমার লেখা সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে যারা পড়তে ভালোবাসেন, তারাই মূল পাঠক।

 

বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে আপনি নিজের অবস্থান কীভাবে দেখেন?

আমি এখনো শিখছি এবং নিজেকে পাঠক হিসেবেই দেখি। নিজের জায়গা তৈরি করতে সময় লাগবে, তবে পথচলা শুরু হয়ে গেছে।

 

বাংলা ভাষায় লেখালেখির ক্ষেত্রে বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও সুবিধা কী?

চ্যালেঞ্জ হলো পাঠকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সুবিধা হলো বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার।

 

কোন লেখক বা বই আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

 

বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

যতদিন পাঠক থাকবে, বাংলা সাহিত্য বিকশিত হবে। নতুন লেখকের আগমন ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করছে।

 

লেখালেখি ছাড়া আর কোন শিল্পমাধ্যম আপনাকে প্রভাবিত করে?

সঙ্গীত ও চিত্রকলা—এগুলো আমার কল্পনাশক্তি বাড়ায়।

 

ডিজিটাল যুগে লেখকদের ভূমিকা কীভাবে বদলেছে?

এখন লেখকরা সরাসরি পাঠকের সাথে যুক্ত হতে পারেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।

 

আপনার সবচেয়ে প্রিয় নিজের লেখা কোনটি? কেন এটি বিশেষ?

আমার একটি ছন্দময় কবিতা, যা আমাকে লেখালেখিতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

 

লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া।

 

নতুন লেখক বা লিখতে আগ্রহীদের জন্য কোনো পরামর্শ দিন।

বেশি পড়ুন, নিয়মিত লিখুন। লিখতে লিখতেই একদিন স্বপ্নপূরণের পথে এগোতে পারবেন।

 

পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনই আমার শক্তি ও অনুপ্রেরণা। আপনাদের প্রশংসা আমার সাহিত্যযাত্রাকে সহজ করেছে। কৃতজ্ঞতায় আপনারা আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবেন। পড়তে থাকুন, সাথে থাকুন।

 

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য। আপনার জন্য শুভকামনা।

 

আপনাদের পরমপাঠ পরিবারকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। হরকরা ডটকমের বহুল প্রচার কামনা করি।