লালনের পর- অ্যালেন গিনসবার্গ
আমাদের অসামান্য শিল্পী ফরিদা পারভীন চলে গেলেন। সবাই আমরা দুইদিনের মেহমান, কেউ থাকতে আসে না- কেউ কেউ এমনি যায়, কেউ আবার পরাণ কেটে দাগ রেখে যায়; ফরিদা পারভীনও দাগ রেখে গ্যাছেন- তাঁর কথা ভেবে আমাদের আরও বয়স বাড়ে, ঘন হয়ে বসি- হৃদয়পাটে সুবাস ওড়ে আসে- হরিণের শিঙের মত এক মধুক্ষর নিধি!
লালনের পর
অ্যালেন গিনসবার্গ
বাংলা ভাষান্তর : বদরুজ্জামান আলমগীর
একথা ঠিক যে আমি যুবা বয়সেই
ধরা খাই।
ব্লেইক আমাকে গুমরের খোঁজ দেয় :
অন্য রথীমহারথীরাও বুঝি
তাকেই অনুসরণ করে-
সয়সম্পত্তির ধোঁকায় পড়ো না
বরং পরকালের দিন গুনো
ওভাবে আমাকে উঠতি বয়সেই
হুঁশিয়ার করা হয়।
এখন তো আমি বুড়িয়েছি
আমার চারপাশে বইয়ের পাহাড়
কোটি টাকার বেসাতি
লাখে কৌরালে প্রেম ভাবের হাতছানি
বুঝি না- কীভাবে এই দেহ থুয়ে বের হবো?
অ্যালেন গিনসবার্গ ফরমান করে
আমি নাকানিচুবানি খাই দিনরাত।
আমি এক সাচ্চা প্রেমিকের
কসম মাথায় তুলে বসি
সে আমাকে তার আগাপাশতলা
খুলে বলে,
বলে ওসবের মায়েরে বাপ
এক্ষুণি সটকে পড়ো,
আগে তো নিজের পাছা বাঁচাও,
হিসাব করে পা ফেলো
নর্তনকুর্দনে চিৎপটাং হবে দেখো।
আমি এখন বুড়ো হাবড়া,
ভাবি না আরও বিশটি বছর টিকে থাকবো
বিশ সপ্তাহ আছি কী-না
তার নাই ঠিক।
আগামী এক সেকেন্ডের মধ্যেও আমার
ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারে,উ
চলে যেতে পারি দ্বিতীয় জন্মের তেলেসমাতির
কাণ্ডকারখানার ভিতর।
হয়তো তা আসলে ঘটেই গ্যাছে-
কে জানে আমি বুঝি বা যা বলছি
তা বহুদিনের খোয়াব ঠেলে পয়দা হচ্ছে।
এখন রাত ২টা বাজে
আমাকে আবার উঠতে হবে সকাল সকাল
তারপর টেক্সি করে ২০ মাইল
আমার বাসনাইয়ের পিছে এভাবেই দৌড়াই
আমি নিজের লাগি বোচকা বান্ধি
এই মরণ জোঁকের হাত থেকে
কীভাবে খালাস পাবো?
আমার যে প্রাণভোমরা ছিল
তা বিকিয়ে দিয়েছি কথার ফুলঝুরির কাছে,
আমার যে দেহ ছিল
প্রয়োজনের নাগপাশে আমি তার ছোবড়া বের করেছি
আমার যে মন ছিল একখানি
তা প্রেমের নিঝুমে অবগুণ্ঠিত রেখে দিয়েছি
আমার মধ্যে ছিল যে এককণা স্ফূরণ
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে তা শেষ বিন্দু অবধি
টেনে নিলাম করেছি,
যা ছিল আমার কথার যোগান
আমি তা ফুটানি মারতে মারতে শেষ করেছি
আমার মধ্যে যে মনোবাঞ্ছা ছিল
তা পাছা ফেটে বেরিয়ে গ্যাছে
হয়তো অভিলাষও ছিল আমার আনাচেকানাচে
তা এমন চৌচির লণ্ডভণ্ড শরীরে কীভাবে থাকে-
ভালোবাসা প্রেমের আশকারায়, হামবড়া ভাবে,
বীভৎস খায়েশ আর বিলাসী দুষ্কর্ম্মের প্রবল নখরামিতে?
দেখ কী নাল্লত তোর, অ্যালেন গিনসবার্গ।
নির্ঘুম আমি জেগে আছি
আর ভাবছি আমার ভবলীলা সাঙ্গ হবার কথা
আমার বয়স যখন ১০ বছর ছিল
তার থেকে মৃত্যু আজ কাছের।
ছোটকালে দুনিয়া ছিল আলিশান-
এখন যদি না ঘুমাই
অতি জলদি আমি হেলে পড়বো মৃত্যুর দিকে,
আর যদি ঘুমিয়ে পড়ি
তাহলে হাতছাড়া হয়ে যাবে আমার মুক্তির ছটফটানি-
ঘুমে, কী জাগনায় অ্যালেন গিনসবার্গ
পড়ে আছে মাঝরাতের বিছানায়।
ভোর ৪টায় ওরা আমার খোঁজে আসে
আমি তড়িঘড়ি টয়লেটে গিয়ে লুকাই
ওরা টয়লেটের দরজা ভেঙে ফেলে
দরজা ভেঙে পড়ে এক নিষ্কলুষ পোলার উপর
হুড়মুড় কাঠের কপাট ঝাপটে পড়ে অবুঝ বাচ্চার মাথায়।
আমি একটু উঁচুতে দাঁড়াই আর শুনতে পাই
আমি লুকিয়েছিলাম আমার ছায়া,
তারা অন্য আরেকজনকে ধরে ফেলে
টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়
আমার নিজ গৃহ থেকে কতোক্ষণে আমি নাই হতে পারি?
অচিরেই তারা জানতে পারবে-
আমি নাই, নাই ওখানে।
একটু পরেই আমাকে ধরে নিতে আসবে তারা
কোথায় আমার দেহ আমি গুঞ্জা মারতে পারি?
এই দেহে কী আমিই আছি- না অন্য কেউ
নাকি সবটুকুই ফক্কা?
এই রক্তমাংসের গ্রন্থিল পেশি কী আসলে
এই নড়বড়ে হৃদয়কাণ্ডে, শতছিন্ন বৃক্ষমূলে-
৬৫ বছর ধরে কে খেলেছে ভাজিবুজির খেলা?
আমি নই, কে তাহলে শরিক ফূর্তির অছিলায়?
এখনই এ পালান শেষ হবে।
অচিরেই কোন ক্ষণে আসবে আশার পয়গাম
সত্যিই কী সাচ্চা হবে, অকাট্য সত্য হবে তা?
আমার ভাগ্যে শিঁকে ছিঁড়েছিল,
জোড়া লেগেছি এই অভাগার ফাটা কপাল,
কিন্তু আমি বুঝি মগন ছিলাম ঘুমের ঘোরে
ভয়ের জ্বালায় ঘরে তুলিনি সোনার জেল্লা
হতভাগা আমি খুইয়ে হয়েছি নাকাল।
অ্যালেন গিনসবার্গ তোমারে দেয় কথার দাওয়াই
তার পদাঙ্ক শিরে তুইলো না-
বেলাশেষে তোমার চাঁদ ডোবার পথে।।
Allen Ginsberg : After Lalon.
আরও পড়ুন- ইউনূস এমরের কবিতা

