সভ্যতার জন্ম থেকে ইসলামের আলো: মানব ইতিহাসের মহাপাঠ
পর্ব- ০১
“যারা ঈমান এনেছে, ইহুদী, খ্রিস্টান ও সাবেঈনদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে ও
সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে ও তাদের জন্য কোন ভয় নেই
এবং তারা দুঃখিত হবে না।” (২:৬২)
দুনিয়ার প্রথম বিপ্লব
আধুনিক যুগের ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, উত্তর কুয়েত, দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক এবং
পশ্চিম ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সবচেয়ে প্রাচীন এক সভ্যতা। এই অঞ্চলটি দেখতে
অর্ধচন্দ্রাকৃতি। ফলে ইউরোপের লোকজন এটিকে ক্রিসেন্ট এরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করে। আরবিতে এই
অঞ্চলকে ;দারুসসালাম; নামে ডাকা হয়। ;দারুসসালাম শব্দটি একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ ;শান্তির নিবাস;
বা শান্তির আবাস। এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল ব্যাবিলন শহর, যাকে মাদার অফ দ্যা সিটি বলা হয়।
এর উর্বর ভূখণ্ডে কৃষিকাজ এবং সভ্যতার শুরু হয়েছিল। মানব সভ্যতার প্রথম বিপ্লব এই স্থানে সংগঠিত
হয়েছিল। এই বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে। এই বিপ্লব মানুষকে শিকার ও সংগ্রহের
জীবনধারা থেকে একটি কৃষিনির্ভর, স্থায়ী জীবনধারায় নিয়ে আসে। এটিই ছিল আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি এবং
প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল প্রায় ১০,০০০
খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এখান থেকেই ধর্মের শিকড় পাওয়া যায়। সেখানে কৃষির আবিষ্কারের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা
স্থায়ী হয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের বিকাশ ঘটে। কেউ কেউ এটিকে কৃষি বিপ্লব নামে অভিহিত করেন। পাশ্চাত্য
ধারণা মতে এই বিপ্লবের নাম নিওলিথিক বিপ্লব। বাংলায় এটিকে বলা হয় নব্য প্রস্তরযুগ।
নব্য প্রস্তর যুগ
নব্য প্রস্তর যুগ (নিওলিথিক যুগ) ছিল প্রস্তর যুগের শেষ পর্ব। এটি খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দের আশেপাশে
মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়ে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ থেকে ২,৫০০ অব্দের
মধ্যে সমাপ্ত হয়। এই যুগে মানুষের জীবনে কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু হয়। পাশ্চাত্য মতে এটি নিওলিথিক বিপ্লব
নামে পরিচিত। এই বিপ্লবের ফলে শিকার ও সংগ্রহ নির্ভর জীবন থেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন এবং সভ্যতার
সূচনা হয়।
নব্য প্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কৃষিকাজ শুরু করা এবং পশুপালন। এর ফলে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি
স্থাপন করে এবং খাদ্যের জন্য বন্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেয়।
কৃষিকাজের বিকাশের সাথে সাথে মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে এবং গ্রাম ও শহর গড়ে তোলে।
এই যুগে সূক্ষ্ম এবং কার্যকর পাথরের হাতিয়ারের উন্নত ব্যবহার দেখা যায়। এসময় মানুষ তাঁত ব্যবহার করে
কাপড় তৈরি, ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং নৌকা বানাতে শিখেছিল।
সেই যুগে স্থায়ী বসতি স্থাপনের কারণে সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসায় একটি সংগঠিত সমাজ ব্যবস্থার
উদ্ভব হয়।
নব্য প্রস্তর যুগকে মানব সভ্যতার আধুনিকতার পথে প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই সময়টাতে কৃষি,
পশুপালন এবং স্থায়ী বসতি স্থাপনের মাধ্যমে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে এনে নিজেদের জীবনকে
সহজ ও উন্নত করে। এই যুগেই সভ্যতার ভিত্তি রচিত হয়েছিল। এগুলো পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও
সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নবী নূহ (আঃ)
ইসলামের বর্ণনায়, আদম (আঃ) এর বংশধর নারী পুরুষরা তার শিক্ষা অনুসারে এক আল্লাহর উপাসনা করত।
তাদের মধ্যে অনেক ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন যাদেরকে তার সম্প্রদায়ের মানুষ সম্মান ও মান্য করত। বলা হয় যে,
যখন এই ধার্মিক লোকেরা মারা যায় তখন তাঁদের ভক্তরা তাঁদের বসার জায়গাগুলোকে উপাসনালয় বানিয়ে নেয়
এবং তাঁদের চিত্রও সেখানে ঝুলিয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে তারা তাঁদেরকে স্মরণ করে তারাও তাঁদের
মত আল্লাহর উপাসনা করবে। তারপর যখন কিছু কাল অতিবাহিত হল, তখন তারা এই চিত্রগুলোর মূর্তি নির্মাণ
করল। আরও কিছু কাল পর পরবর্তী বংশধররা শয়তানের প্ররোচনায় এসব মূর্তির উপাসনা করতে শুরু করে।
এসব পথভ্রষ্ট মানুষদের সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ) কে তাদের মাঝে
নবী হিসাবে প্রেরণ করেন।
কুরআনে ৪৩ বার নূহ নবীর উল্লেখ পাওয়া গেছে। কুরআন অনুসারে, নূহ (আঃ) সাড়ে নয়শত বছরের দীর্ঘ বয়স
লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য কাজ করেন। কিন্তু তার জাতি তাঁকে
প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তার জাতি ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস হয়ে যায়।
বাইবেলে বর্ণনা অনুসারে, নোয়াহ বা নূহ (আঃ) ছিলেন প্লাবন পূর্ব যুগের নবী। তার পিতা ছিলেন একজন
গোত্রপতি। মাতার পরিচয় জানা যায়নি। নোয়াহ বা নূহ (আঃ) এর বয়স যখন পাঁচশত বছর তখন সেম (শ্যাম বা
সাম), হামম্ এবং যাপেট নামে তার তিন পুত্রের জন্ম হয়।
বুক অব জেনেসিসের ৬-৯ পরিচ্ছেদে নূহ (আঃ) এর প্লাবনের বিশদ বর্ণনা আছে। বর্ণনায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর
মানুষের বিশাল পাপের কারণে ঈশ্বর পৃথিবীতে মহাপ্লাবনের মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস করেন। নূহের নৌকায় তুলে
নেয়া পৃথিবীর সমস্ত প্রানীর জোড়া থেকে পুনরায় তাদের সৃষ্টি করেন। ঈশ্বর এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেন যে,
তিনি আর কোন প্লাবন সৃষ্টি করবেন না।
তাওরাত অনুসারে নূহ নবীর নৌকা তিন শত হাত দীর্ঘ, প্রস্থে পঞ্চাশ হাত ও উচ্চতায় ত্রিশ হাত আর তিন তলা
বিশিষ্ট ছিল। নৌকায় ৮ জন লোক ছিলেন। তারা হলেন: নূহ নবী, তার স্ত্রী, তাদের তিন ছেলে সেম (শ্যাম বা সাম),
হাম এবং যেপেথ এবং ছেলেদের স্ত্রীরা।
বিভিন্ন বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ক্রিসেন্ট এরিয়া বা ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় জন্মেছিলেন। অনেকের মতে
তিনি আধুনিক ইরাকের কুফা শহর বা এর কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে বসবাস করতেন।
সাম
ইসলাম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্ম মতে, সাম (শ্যাম বা সেম) ছিলেন নূহ (আঃ)-এর পুত্র এবং মহাপ্লাবন থেকে বেঁচে
যাওয়া অন্যতম ব্যক্তি। তাঁর বংশধররাই মহাপ্লাবনের পর পৃথিবীতে নতুন করে জনবসতি স্থাপন করে এবং
মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি করে। মহাপ্লাবনের পর পৃথিবীতে মানবজাতির
পুনর্জন্মের ক্ষেত্রে সামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেমেটিক ধর্ম
দারুসসালাম অঞ্চলে মাদার অফ দ্যা সিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সেমিটিক ধর্ম। এর ধারাবাহিক ধর্ম
মূলত একেশ্বরবাদী ধর্মগুলিকে বোঝায়। সেগুলোর মধ্যে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম প্রধান। এই ধর্মগুলি
একেশ্বরবাদ, একজন ব্যক্তিগত স্রষ্টার ধারণা এবং নবী বা বার্তাবাহকদের মাধ্যমে যোগাযোগের ধারণার
উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সেমিটিক শব্দটি আব্রাহামিক ধর্মগুলির সাথে সম্পর্কিত এবং এর উৎপত্তি
শ্যাম বা সেম বা সাম নামের নূহ (আঃ) এর পুত্রকে নির্দেশ করে।
আব্রাহামিক ধর্ম
আব্রাহামিক ধর্ম বলতে মধ্যপ্রাচ্যের এমন একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোকে বোঝায়, যেগুলোর ধর্মীয় উৎপত্তি বা
ইতিহাস নবী ইব্রাহিম (আঃ)-এর সাথে সম্পর্কিত। প্রধান তিনটি আব্রাহামিক ধর্ম হলো ইহুদি, খ্রিস্টান এবং
ইসলাম। এই ধর্মগুলো এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী এবং নবী ইব্রাহিম (আঃ) কে তাদের পূর্বপুরুষ হিসেবে সম্মান করে।
চলবে…

