আনাল হক! বিতর্কে মোড়ানো এক প্রেমাত্মা- ইমরান শা’কির ইমরু
“আনাল হক” এই এক উক্তির জন্য তিনি হয়েছেন ইতিহাসের এক বিস্ময়কর শহীদ।
যিনি নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন প্রভুর প্রেমে। পাঠকরা ইতোমধ্যেই বুজতে পেরেছেন আমি কার কথা বলতে চাচ্ছি। ঠিক ধরেছেন, হ্যাঁ আমি বলছি প্রেমে বিলীন হওয়া এক আত্মার কথা, হোসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ রহ. এর কথা।
৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের ফারস প্রদেশের বাইজা শহরে জন্ম নেন এক শিশু—হোসাইন বিন মনসুর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন তাঁতি; সেখান থেকেই ‘হাল্লাজ’ অর্থাৎ ‘সূতকাটা’ নামটির উৎপত্তি।
শৈশব থেকেই তাঁর চোখে ছিল আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, হৃদয়ে ছিল অদৃশ্যের প্রতি এক গভীর টান। এই হৃদয়ের টানই তাঁকে নিয়ে যায় আত্মার অনন্ত পথের দিকে।
হাল্লাজ বসরায় গিয়ে সুফি সাধকদের ছায়ায় আত্মিক জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর গুরু ছিলেন বিখ্যাত সুফি জুনাইদ আল বাগদাদি (রহ:) কিন্তু হাল্লাজ নিজে ছিলেন ভিন্ন ধাঁচের। তিনি বিশ্বাস করতেন, আত্মিক সত্য জনসমক্ষে বলা উচিত, যেন সাধারণ মানুষও আল্লাহর প্রেমে জেগে ওঠে।
“আমি সত্য” — আত্মার চূড়ান্ত উপলব্ধি
আনাল হক
এই ঘোষণা ছিল এক গভীর আত্মজ্ঞান ও আল্লাহর সঙ্গে একাত্মতার নিদর্শন।
মনসুর হাল্লাজ বলতে চেয়েছিলেন,
“আমার মাঝে কিছু নেই, কেবল তোমার অস্তিত্ব। আমি নেই, তুমি আছ।”
মনসুর হাল্লাজের সমগ্র জীবন ছিল বিতর্কে মোড়ানো। কথিত আছে একদিন ধ্যানরত অবস্থায় তিনি এক জ্যোতির্ময় পুরুষকে দেখতে পান। মনসুর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কে। ওই পুরুষ তাঁকে বলেন ‘আনাল হক’ অর্থাৎ ‘আমিই পরম সত্য’। উল্লেখ্য ’আল-হক’ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের একটি। আল্লার এই রূপ এবং বাণী দ্বারা তিনি এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উচ্চারণ করতে থাকেন ‘আনাল হক’। এই থেকে তিনি ‘আনাল হক’ নামে পরিচিতি লাভ করেন
‘আমিই পরম সত্য’ এই অর্থে আল্লাহ বিবেচনা করে, নিজেকে আনাল হক বলাকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিলেন সেকালের অনেক ওলামায়ে কেরাম। কেউ কেউ তাঁকে ফেরাউনের সাথে তুলনা করেছিলেন। আনাল হকের সমর্থকরা এর প্রতিবাদ করে বলে থাকেন ফেরাউন আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে, নিজেকে আল্লাহ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আনাল হক নিজেকে আল্লাহর অংশ হিসেবে নিজেকে ‘আমিই পরমসত্য’ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর এরূপ প্রতিটি বাণী ছিল আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেই। সুফিরা জানতেন, মনসুর কোন অর্থে নিজেকে আনাল হক বলছেন।
সাধারণত সুফিমতাদর্শীদের গুপ্ত জ্ঞান অন্যের কাছে প্রকাশ করাটা অমার্জনীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু মনসুর এসকল বিষয় অগ্রাহ্য করে, সর্বসাধারণের কাছে সকল গুপ্ত বিষয় প্রকাশ করতেন লিখে এবং মৌখিক অভিভাষণে। এই কারণে অন্যান্য সাধকরা তাঁর শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। মানসুর হাল্লাজ গদ্য এবং পদ্যে সুফিবাদের গুপ্ত কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো কিতাব আল-তাওয়াসিন, যেখানে দুটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় আল্লাহ-তাআলা এবং ইবলিশ-শয়তানের কথোপকথনের বর্ণনা আছে।
মানসুর হাল্লাজ তার বইয়ে বলেন-
“যদি আল্লাহকে নাই চিনতে পারো, তাহলে কমপক্ষে তার নিদর্শনকে তো চেনো। আমিই সৃজনশীল সত্য- আনাল হক, কারণ সত্যের ভিতর দিয়ে আমিই পরম সত্য।
তার মতবাদের সারমর্ম ছিল “সমগ্র মানবজাতির এক নিগূঢ় অন্তদর্শন: তিনি তার স্রষ্টাকে অন্তরের অন্তস্থলে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন এবং চেয়েছিলেন যাতে করে অন্যরাও তা খুঁজে পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঐশ্বরিক বাস্তবতায় পৌঁছানোর জন্য গতবাঁধা আনুষ্ঠানিক ধর্মকর্মের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
‘আমিই পরম সত্য’ এই অর্থে আল্লাহ বিবেচনা করে, নিজেকে আনাল হক বলাকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাকে বিচারকার্যের সম্মুখীন হতে হয় এবং দীর্ঘ ১১ বছর বাগদাদ নগরে কারাবাস করেন। এরপর ৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ জনসমক্ষে তৎকালীন সরকারি বিচারকদের নির্দেশে হত্যা করা হয়।
মানসুর বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহর সঙ্গে আত্মিক মিলন সম্ভব, আর এটাও বিশ্বাস করতেন যে তিনি নিজে তার সঙ্গে এক হয়ে মিলে গেছেন। উনার মৃত্যুদন্ডের পর উনার শরীরকে টুকরো টুকরো করে কাটা হয়, কারণ উনি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় একবার ঘোষণা করেন যে “আনা আবরারুল হাক”(আমি সত্যের আবরার)। উনার মৃত্যুদন্ড হয় বাগদাদে প্রকাশ্য দিবালোকে। তারা তাকে হত্যার পরে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে আর তারপর সেই কাটা দেহাবশেষকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। যখন উনার হাত, পা, জিহ্বা, আর সবশেষে মাথা কেটে ফেলা হয়, তখনো তিনি উচ্চারণ করতে ছিলেন “আনাল হক (আমিই পরম সত্য)। “যখন সবশেষে তার মাথা কেটে ফেলা হয়। তিনি খোদার সাথে তার গভীর সম্পর্কের প্রমাণ দিতে চেয়েছিলেন এমনকি তাকে হত্যা করে ফেলতেও বলেছিলেন। এবং নিজের মৃত্যুদন্ডকে স্বেচ্ছায় বরন করেন, এই বলে যে “সেই এক স্বত্তার সাথে মিলনেই প্রকৃত আনন্দ।”
আল্লাহর সাথে তার মিলিত হবার বাসনার কারণে ততকালীন বহু মুসলিম একেশ্বরবাদী ইসলামিক মতাদর্শকে বিকৃত করার অভিযোগ করে উনাকে “ছদ্ম-খ্রিস্টান” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আরেকজন ততকালীন বিখ্যাত সূফি আত্তার (রাহ্ঃ) উনার কাজকে বীরত্বপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ উনাকে (হাল্লাজকে) যখন বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন সূফি উনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, “প্রেম কি?”। তিনি জবাব দেন যে, “তুমি আজ, কাল, আর পরশুদিন তা নিজ চোখেই দেখবে”। যেদিন তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়, তার পরের দিন তার দেহাবশেষ পোড়ানো হয়, আর তার পরের দিন তার দেহভস্ম বাতাসে মিলিয়ে ফেলা হয়। আত্তার (রাহ্ঃ) বলেন যে, “এটাই প্রেম”।
হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি এটাকেই অত্যন্ত আশ্চর্য মনে করি যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন তুর পর্বতে আল্লাহর জ্যোতি দর্শন করেন, তখন গাছ থেকে ইন্নী আনাল্লাহ’ নিশ্চয় আমি আল্লাহ এই শব্দ শােনা গিয়েছিল। বলা হয়, এ আওয়াজ ছিল স্বয়ং আল্লাহর, গাছের নয় । তা হলে হযরত মানসুর হাল্লাজ এর মুখ থেকে যখন ‘আনাল হক’ কথাটি বের হয়, তখন কেন বলা হবে না তার মুখের বাণীটি আসলে আল্লাহর বাণী। হযরত হুসাইন মানসুর হাল্লাজ (রহঃ) মুখের কথা নয়। হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ আরও বলেন, তাঁর বেলায়ও তাে বলা যেতে পারে যে, তার জবানে খােদ আল্লাহই ‘আনাল হক” কথাটি উচ্চারণ করেছেন। এটি হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর কথা নয়। তিনি নিজে আল্লাহ হওয়ার দাবীও করেননি।
মনসুর হাল্লাজ প্রমান করে যান প্রেমের পথ কণ্টকাকীর্ণ হলেও, সেটিই সত্যের পথ। আত্মিক অভিজ্ঞতা কখনও শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না—তবে তা হৃদয়ে অনুভব করা যায়।
আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলীন করা মানেই নিজেকে মুক্ত করা।
তাঁর কবিতা ও উক্তিগুলিতে ফুটে উঠেছে প্রেম মানে নিজেকে হারানো, প্রেম মানে আল্লাহর মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়া।
মানসুর বলেন “তুমি যদি আমাকে হত্যা করো, আমার রক্তে তবু থাকবে সেই প্রেমের অক্ষর, কারণ আমি আর তুমি—দুই নয়, এক।”
হোসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ — একজন প্রেমিক, একজন বিদ্রোহী, একজন শহীদ। যাঁর মৃত্যু হয়নি, যিনি আজও বেঁচে আছেন প্রেমিক হৃদয়ে।

